এই পথ কেবল শারীরিক সুস্থতা বা মানসিক প্রশান্তির পথ নয়,বরং এটি হলো জাগৃত চেতনার এক উচ্চতর উত্তরণ,যা সাধককে মর্ত্যের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে দিব্যলোকের দ্বারে পৌঁছে দেয়। কিন্তু সময়ের নির্মম স্রোতে এবং আধ্যাত্মিকতার বাণিজ্যিকীকরণের ফলে এই অতি প্রাচীন ও গোপন কৌশলগুলি আজ প্রায় বিস্মৃত।
বর্তমান যুগে তথ্যের প্রাচুর্য আমাদের চারপাশে। ইন্টারনেটের ভিড়ে বা কিছু বই পড়ে আমরা মনে করি আমরা সব জেনে গেছি। কিন্তু তথ্যের সংকলন কখনোই প্রকৃত জ্ঞান হতে পারে না। বিশেষ করে 'অন্তর্মুখী প্রাণায়াম'-এর মতো সূক্ষ্ম বিষয়ে সঠিক দিশা ছাড়া অনুশীলন কেবল শক্তির অপচয়ই করে না, বরং অনেক ক্ষেত্রে বিপরীত ফল বয়ে আনে।
আমরা যখন কেবল বাহ্যিক কৌশল বা যান্ত্রিকভাবে শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করি,তখন আমরা শরীরকে সুস্থ করতে পারি ঠিকই, কিন্তু আত্মিক উত্তরণ সম্ভব হয় না। প্রকৃত প্রাণায়াম হলো প্রাণশক্তির এক সুনিপুণ চালনা,যা মেরুদণ্ডের সঠিক বিন্যাস,মুদ্রার সঠিক প্রয়োগ এবং একজন জীবন্ত গুরুর নির্ভুল নির্দেশনার ওপর নির্ভরশীল।
এই অন্ধকার সময়ে,যখন অনেক সরলপ্রাণ সাধক ভুল পথে পরিচালিত হয়ে দিশেহারা,তখন সেই বিলুপ্তপ্রায় গোপন আধ্যাত্মিক ধারাটিকে পুনরুজ্জীবিত করার এক আন্তরিক সংকল্প নিয়ে সামনে এসেছেন শ্রী মনোজ চক্রবর্ত্তী (অর্জ্জুনাচার্য্য)।
সনাতন ভারতবাসীর আধ্যাত্মিক অভিলাষী এবং অন্তরের ডাক শোনা সেই সমস্ত 'অর্জুন'-দের প্রতি এক অঙ্গীকার হিসেবে তিনি এই পথপ্রদর্শনের কথা বলেছেন।
এই আলোচনাটি কেবল কিছু নিয়মের সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি আধ্যাত্মিক যাত্রার মানচিত্র। এখানে শরীর,মন এবং শ্বাসের যে অদ্ভুত সমন্বয় এবং সুষুম্না নাড়ীর মধ্য দিয়ে দিব্য শক্তির প্রবাহের কথা বলা হয়েছে, তা কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়,বরং অভিজ্ঞতার নির্যাস। সঠিক আসনে বসা থেকে শুরু করে নভো মুদ্রা, শরীরবন্ধ এবং আজ্ঞা চক্রে দৃষ্টি নিবদ্ধ করার যে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম রহস্য,তা এখানে উন্মোচিত হয়েছে।
আসুন,বাহ্যিক কোলাহল ত্যাগ করে অন্তরের নীরবতায় প্রবেশ করি এবং জানি কীভাবে সঠিক পদ্ধতিতে প্রাণায়ামের মাধ্যমে চিত্ত-শান্তি ও ধ্যান-মগ্নতার আলো জ্বালানো সম্ভব। এই লেখাটি সেই সমস্ত সত্যসন্ধানীদের জন্য,যারা কেবল শরীর নয়,বরং আত্মার মুক্তি এবং পরম শান্তির সন্ধানে একনিষ্ঠ।
মুখবন্ধঃ
আত্মসাক্ষীক্রিয়া কেবল শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ন্ত্রণের কোনো বাহ্যিক অনুশীলন নয়; এটি শরীর, শ্বাস,মন ও চেতনার গভীরে প্রবেশের এক শৃঙ্খলাবদ্ধ সাধনাপথ। এই সাধনার প্রকৃত উদ্দেশ্য বাহ্যিক কসরত প্রদর্শন নয়,বরং অন্তরের অস্থিরতা অতিক্রম করে আত্মসচেতনতা,একাগ্রতা ও প্রশান্তির দিকে অগ্রসর হওয়া।
এই পথে আসন, মুদ্রা,দৃষ্টি,শ্বাসের ছন্দ এবং মনের স্থিরতা—প্রতিটি বিষয়েরই বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সামান্য অসতর্কতা বা ভুল পদ্ধতি যেমন সাধনার সুফলকে ব্যাহত করতে পারে,তেমনি ধৈর্য,নিয়মিততা ও সঠিক নির্দেশনা সাধককে ধীরে ধীরে অন্তর্মুখী উপলব্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তাই কোনো কৌশল কেবল পড়ে বা দেখে অনুকরণ না করে,তার উদ্দেশ্য,প্রয়োগ ও সীমাবদ্ধতা যথাযথভাবে বোঝা প্রয়োজন।
ভারতীয় সাধনপরম্পরায় গুরু-শিষ্য সম্পর্কের গুরুত্ব অপরিসীম। গুরু কেবল কোনো প্রক্রিয়া শেখান না; তিনি সাধকের প্রবণতা,সামর্থ্য ও মানসিক অবস্থার উপযোগী পথনির্দেশ দেন। সেই কারণে উন্নত স্তরের প্রাণায়াম,মুদ্রা বা অন্তর্মুখী সাধনা অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল শিক্ষকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শেখাই শ্রেয়।
এই লেখায় আসন,মেরুদণ্ডের অবস্থান,জিহ্বা ও দৃষ্টির প্রয়োগ,শ্বাসের অন্তর্মুখী প্রবাহ,নিয়মিত অনুশীলন এবং সাধনায় সতর্কতার মতো বিভিন্ন বিষয় আলোচনা করা হয়েছে।
লেখাটির মূল আহ্বান হলো—অন্ধ অনুকরণ নয়, সচেতন অনুশীলন; অহংকার নয়,বিনয়; তাড়াহুড়ো নয়, ধৈর্য; এবং বিচ্ছিন্ন কৌশল নয়, শরীর-মন-শ্বাসের সমন্বিত সাধনা।
তবে প্রত্যেক সাধকের শারীরিক অবস্থা এক নয়। হৃদরোগ,উচ্চ রক্তচাপ,শ্বাসকষ্ট,মেরুদণ্ডের সমস্যা, গর্ভাবস্থা বা অন্য কোনো শারীরিক অসুস্থতা থাকলে অন্তর্মুখী প্রাণায়াম ও শ্বাসধারণের অনুশীলন শুরু করার আগে যোগ্য চিকিৎসক ও অভিজ্ঞ গুরুর পরামর্শ নেওয়া উচিত। সাধনা কখনো শরীরের ওপর জোরপ্রয়োগের নাম নয়; বরং শরীরকে সম্মান করে ধীরে ধীরে অন্তরের দিকে যাত্রা করার নাম।
এই রচনার উদ্দেশ্য কোনো মত,ব্যক্তি বা পদ্ধতিকে অবমূল্যায়ন করা নয়। বরং সাধনার প্রতি শ্রদ্ধা, সতর্কতা ও যথার্থ অনুসন্ধানের মনোভাব জাগিয়ে তোলা।
আত্মসাক্ষীক্রিয়া বা অন্তর্মুখী প্রাণায়ামের প্রকৃত সুফল পেতে হলে শরীর ও মনের মধ্যে এক অদ্ভুত সমন্বয় প্রয়োজন,যার শুরু হয় সঠিক বসার মাধ্যমে। আমরা অনেকেই গুরুত্ব দিই শ্বাসের ওপর,অবশ্যই দেওয়া উচিৎ,কিন্তু ভুলে যাই মেরুদণ্ডের সোজা অবস্থানের কথা।
মেরুদণ্ড বাঁকা থাকলে ফুসফুস তার পূর্ণ ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে না,ফলে শরীর পর্যাপ্ত অক্সিজেন পায় না। বিশেষ করে অন্তর্মুখী প্রাণায়ামে শক্তি বৃদ্ধির জন্য ডায়াফ্রামের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য।
শরীর যখন সঠিক মুদ্রায় থাকে,তখনই প্রাণশক্তি সঠিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে। তাই আসনে বসা আমাদের প্রথম ও শক্তিশালী পদক্ষেপ।"
"সাধনার পথে স্থিরতা ও ধৈর্যের কথা যখনই মনে পড়ে,আমার চোখে ভেসে ওঠে আমার পরম শ্রদ্ধেয় গুরুদেব যোগাচার্য্য বাচস্পতি মহামহোপাধ্যায় শ্রী অশোক কুমার চট্টোপাধ্যায়ের সেই সৌম্য রূপ।
তিনি নিজেই সুখাসনে বসতেন তাঁর যত ছবি দেখবেন,প্রতিটি ছবিতেই উনি সুখাসনে বসা।
তিনি আমাদের পরম মমতায় উপদেশ দিতেন— "সুখাসনেই বসো,কারণ এই আসনই শ্রেয়"।
তাঁর কথা ছিল,দীর্ঘক্ষণ একাসনে অবিচল থাকাই হলো প্রকৃত সাধনার মূল ভিত্তি। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের সেই ছোট্ট শুরু থেকে ধীরে ধীরে চার-পাঁচ ঘণ্টার দীর্ঘ সাধনায় যেতে হবে। তাই তাঁর সেই আশীর্বাদে এবং নির্দেশনায়,দীর্ঘস্থায়ী একাগ্রতার জন্য "সুখাসনের চেয়ে শ্রেয় আর কিছুই হতে পারে না।"
প্রাণায়ামে বসার সঙ্গে সঙ্গেই মুখ বন্ধ করে জিহ্বাকে একটি বিশেষ অবস্থানে স্থাপন করতে হয়—এই অবস্থানকেই বলা হয় "নভো মুদ্রা"। জিহ্বাকে ধীরে,কোমলভাবে উল্টে নিয়ে তালুর নরম অংশে আলতো করে স্পর্শ করিয়ে স্থির রাখতে হবে। যেন অন্তরের সমস্ত চঞ্চলতা স্তব্ধ হয়ে প্রাণশক্তি একাগ্রতার পথে প্রবাহিত হতে পারে।
তারপর "শরীরবন্ধ" স্থাপন করতে হয়। ডান'পায়ের গোড়ালি সম্পূর্ণ টেনে মূলাধার পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে,যেখানে কুলকুণ্ডলিনী—(গুরুবক্তাগম্য) সেই স্বয়ম্ভুলিঙ্গকে বেষ্টন করে"—অবস্থিত আছেন,সেখানে গোড়ালি দিয়ে সযত্নে চাপ দিয়ে বসতে হবে। এরপর ডান পা বাম পায়ের ভাঁজে রেখে মুদ্রা স্থাপন করতে হয়।
এই অবস্থান কেবল দেহের কোনো ভঙ্গি নয়; এটি যেন শরীর,শ্বাস ও চেতনার এক গভীর মিলনস্থল—যেখানে সাধক ধীরে ধীরে বাহিরের জগত থেকে অন্তরের নীরব,পবিত্র ও রহস্যময় জগতে প্রবেশ করেন।
এই অবস্থায় অন্তর্মুখী প্রাণায়ামের জন্য কোন মুদ্রা সঠিক—তা একজন অভিজ্ঞ গুরুর কাছ থেকেই জেনে নেওয়া উচিত। কারণ,মুদ্রা ও প্রথম অবস্থায় সঠিকভাবে প্রয়োগ না হলে ডায়াফ্রাম তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতায় কাজ করতে পারে না।
আর ডায়াফ্রাম যথাযথভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত না হলে প্রাণায়ামের শ্বাসও সঠিক স্থানে পৌঁছায় না। তাই প্রাণায়ামে মুদ্রার সঠিক প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য।
এরপরে অধিক অভ্যাসে আসে পেটের ভূমিকা এখানেও পেটের এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে যা গুরুবক্তাগম্য। যথাযথভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত না হলে প্রাণায়াম অন্তর্মুখী হয় না।
এবার শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে এক সুনিপুণ সামঞ্জস্যে আনতে হবে। মূলাধার চক্র থেকে শুরু করে পায়ের গোড়ালি, গোড়ালির সেই সোজা মুদ্রার অবস্থান থেকে নাভি,তারপর সোজা হয়ে কণ্ঠ ও নাকের অগ্রভাগ, কাঁধ, বুক, ঘাড় এবং মাথা—তথা কূটস্থ; সবকিছু যেন সমান্তরালভাবে একই সরলরেখায় অবস্থান করে। শরীরের প্রতিটি সংযোগস্থলের এই নিখুঁত বিন্যাস অত্যন্ত জরুরি।
যা কেবল গুরু নিজে বসে প্রদর্শন করে বুঝিয়ে দিতে পারেন। কারণ,মাথা সামান্য এদিক-ওদিক হলে বা সামান্য নিচে ঝুঁকে থাকলে,সুষুম্না নাড়ী মধ্য দিয়ে বয়ে চলা সেই দিব্য শক্তির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়।"
কেননা শক্তির এই জাগরণ ঘটবে নাভিচক্রে,সেই মণিপুর চক্রে—যেখানে প্রজ্বলিত থাকে তেজতত্ত্ব বা অগ্নিতত্ত্ব। এই অন্তরীক্ষ যুদ্ধে আপনিই হবেন অর্জুন,আর আপনার লক্ষ্য হবে সেই ভগবানস্বরূপ গুরুর সাথে একীভূত হওয়া, অথবা গুরুর সেই দিব্যদেশে পৌঁছানো যাকে বলা হয় 'কূটস্থ'।
এই কূটস্থে যতক্ষণ অবস্থান করা যায়,ততক্ষণ মন স্তব্ধ হয়ে যায়; মন বিলীন হয়ে যায়। এই মনাতীত অবস্থাই হলো পরম শান্তি; দিনে যত বেশি সময় এই শূন্যতা বজায় থাকে,ততই মঙ্গল, কারণ যেখানে মন নেই,সেখানে পাপ-পুণ্যের কোনো দ্বন্দ্বে আর আটকা পড়ার সুযোগ নেই।